শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২০
লেখালেখি ডেস্ক
২ জুলাই ২০২০
৮:৫৮ অপরাহ্ণ
করজে হাসানা : অভাবীদের স্বাবলম্বী করার কুরআনিক ব্যবস্থাপত্র
করজে হাসানা : অভাবীদের স্বাবলম্বী করার কুরআনিক ব্যবস্থাপত্র

২ জুলাই ২০২০ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

বর্তমানে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে সারাবিশ্ব কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পার করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে অর্থনৈতিক এ মন্দার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। এ ক্ষেত্রে করজে হাসানা হলো অভাবীদের স্বাবলম্বী করার কুরআনিক ব্যবস্থাপত্র।
করজ বা কারদুন শব্দটি আরবি। অর্থ ঋণ, ধার বা কর্জ; আর হাসানা অর্থ উত্তম। দু’টি শব্দের মিলিত অর্থ হলো ‘উত্তম ঋণ’। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায়, সওয়াবের নিয়তে বিনা শর্তে কাউকে কোনো কিছু ঋণ দিলে তাকে ‘কর্জে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ বলে। অর্থাৎ এমন ঋণ বা করজ দেয়া যেটা সময়মতো পরিশোধ করা হবে; কিন্তু দাতা কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা সুবিধা নিতে পারবেন না। এর উদ্দেশ্য হলো, অবহেলিত সমাজের প্রয়োজন পূর্ণ করা। তা হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্যের বাইরেও নানা কারণে মানুষের করজে হাসানার দরকার হতে পারে। সবসময় ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ থাকে না। পরে সে অর্থ ফেরত দেয়ার সামর্থ্য সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সুদের বিকল্প হিসেবে কর্জে হাসানার গুরুত্ব অপরিসীম। সুদকে মহান আল্লাহ হারাম ঘোষণা করে করজে হাসানার নিয়ম করে দিয়েছেন। যেন মানুষ সাময়িকভাবে করজে হাসানা নিতে পারে সুদ ছাড়া এবং পরে তা দিয়ে দিতে পারে। কুরআনের অনেক স্থানে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ‘কর্জে হাসানা’র কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, নিশ্চয় দানশীল পুরুষগণ ও নারীগণ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদের দেয়া হবে বহুগুণ বেশি এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।’ (সূরা আল হাদিদ : ১৮) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে আহকামুল বয়ানে বলা হয়েছে একের ভেতর দশ গুণ বা তার চেয়েও বেশি সাতশ’ গুণ। আর এ বর্ধনে নিয়তের ঐকান্তিকতা প্রয়োজন এবং স্থান কালের ভিত্তিতে তা হতে পারে। তবে এজন্য শর্ত হচ্ছে, প্রদানকৃত বস্তুটি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ঋণদাতা খাতককে তাগাদা না দেয়া। যেমনটি অপর আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আর যদি সে (খাতক) অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তার অবকাশ (সময় দেয়া উচিত)। আর যদি তোমরা সদকা করো তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে।’(সূরা বাকারা : ২৮০) এর মাধ্যমে আমাদের পরস্পরের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সুদৃঢ় বন্ধন, দারিদ্র্য বিমোচন ও ধনী-গরিবের বিভেদ দূরীভূত হওয়া সহজসাধ্য। সুদখোরদের অভ্যাস হচ্ছে, খাতক নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধে সক্ষম না হলে সুদের অঙ্ক আসলের সাথে যোগ করে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের কারবার চালানো। উপরন্তু সুদের হারও আগের চেয়ে বাড়িয়ে দেয়া। এখানে শ্রেষ্ঠতম বিচারক আল্লাহ তায়ালা আইন প্রণয়ন করে দিয়েছেন, কোনো খাতক বাস্তবিকই নিঃস্ব হলে বা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে তাকে অতিষ্ট করা জায়েজ নেই। যেমনটি আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩০) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে আহকামুল বয়ানে বলা হয়েছে, সুদ খাওয়া থেকে বিরত না হলে এই হারাম কাজ তোমাদের কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কারণ সুদ খাওয়া মানে আল্লাহ ও তার রাসূলের সা: বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। কিন্তু কর্জে হাসানা পুরো এর বিপরীত। এতে একদিকে যেমন খাতকের উপকার হয়, তেমনি সুদ থেকেও বাঁচা যায়।
আমরা যদি পবিত্র কুরআনের সদকা বিষয়ের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাবো যে, সদকা বা দান ইসলামে সৎকর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও উত্তম হচ্ছে কর্জে হাসানা। যে কারণে জগতের কোনো কিছুর যিনি মুখাপেক্ষী নন, যিনি সব বস্তু-মোহ থেকে নিরপেক্ষ সেই সর্বশক্তিমান মহিমান্বিত আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাহর জন্য আমাদের কাছে ‘কর্জে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ চেয়ে পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘কে সে, যে আল্লাহকে কর্জে হাসানা (যে বিনিয়োগ স্বার্থভাবে দেয়া হয়) প্রদান করবে? তিনি তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন।’ (সূরা বাকারা : ২৪৫) ঋণ দিলে তার বৃদ্ধি করার কথা হাদিসে এসেছে । রাসূল সা: বলেছেন, কোনো একজন মুসলিম অন্য মুসলিমকে দু’বার ঋণ দিলে এ ঋনদান আল্লাহর পথে সে পরিমাণ সম্পদ একবার সদকা করার সমতুল্য। ( ইবনে মাজাহ : ২৪৩০)
অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন : আর সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহকে দাও উত্তম ঋণ। তোমরা তোমাদের আত্মার মঙ্গলের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে তোমরা তা পাবে আল্লাহর নিকট। উহা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর। আর তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো আল্লাহর নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা : মুজাম্মিল : ২০) এখানে আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে এমনভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যেন ব্যয়কারী আল্লাহকে ঋণ দিচ্ছেন।
বর্ণিত উপরোক্ত আয়াতগুলোর মর্মার্থ হলো যিনি নামাজ পড়েন, যাকাত দেন, কর্জে হাসানা দেন এবং আল্লাহ পাকের কাছে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চানÑ তাহলে তাকে আল্লাহ কর্জে হাসানার সওয়াব বহুগুণে দেবেন, সম্মানজনক পুরস্কার দিবেন এবং ক্ষমা করে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত। কর্জে হাসানা দিলে বহুগুণ সওয়াবের কথা জানিয়ে রাসূল সা: বলেন, আমি যখন মেরাজে গিয়েছিলাম, তখন বেহেশতের দরজার ওপর লেখা দেখেছি, খয়রাতের সওয়াব ১০ গুণ, আর কর্জে হাসানার সওয়াব ১৮ গুণ। দান বা খয়রাত ফেরত দিতে হয় না কিন্তু কর্জে হাসানা ফেরত দিতে হয়। কর্জে হাসানা ফেরত দেয়ার পরেও প্রায় দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়ার কারণ আছে। মূলত পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক প্রতিটি মানুষকে স্বাবলম্বী করার জন্য ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। রাসূল সা: বলেছেন, হে মুসলমানরা, তালির ওপর তালিযুদ্ধ ছিন্নবস্ত্র পরিধান করা, ঋণ গ্রহণ অপেক্ষা উত্তম। যদি তা শোধ করার শক্তি না থাকে। (মুসনাদ আহমাদ)
কুরআন ও হাদিস থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো :
ক. আল্লাহ কর্জে হাসানার সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। তার বিনিময়ে কিয়ামতের দিন সম্মানজনক পুরস্কার দিবেন এবং ক্ষমা করে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত। আমাদের বেশি বেশি কর্জে হাসানা দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।
খ. আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দেয়ার অর্থ হচ্ছে গরিব-দুঃখী, অভাবীদের, যাদের প্রয়োজন, তাদের ঋণ দেয়া। এর বিনিময়ে তবে আল্লাহ তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করবেন সাধারণ দান সদকা থেকে দ্বিগুণের বেশি সাওয়াব দিবেন।
গ. ইসলামী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য কর্জে হাসানা প্রচলন করা গেলে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
ঘ. করজে হাসানার প্রথা চালু না থাকায় আমাদের সমাজে সুদের প্রচলন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দেশে ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে।
ঙ. করজে হাসানার অভাবে মহাজনী সুদ ব্যবসা বা ব্যক্তিপর্যায় থেকে বেড়ে প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুদের ব্যবসা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতএব বর্তমান করোনাকালীন সময় উচ্চবিত্ত ছাড়া সমাজের সব স্তরে দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য অনেককেই সংসারের খরচ জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজের কাছে অর্থ না থাকায় কর্জ করতে হচ্ছে সুদের ওপর। ইসলামের সুন্দরতম অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করজে হাসানার ব্যাপক প্রচলন করা গেলে সমাজের এ গোষ্ঠীটি উপকৃত হতো। সুদমুক্ত অর্থনীতিক জীবন নির্বাহের সুবিধা পেতেন। সমাজে কমে আসত ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের হার। তাই শুধু ব্যক্তি উদ্যোগ নয় প্রত্যেক ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি আলাদা ‘করজে হাসানা ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিভিন্ন মেয়াদে কর্জে হাসানা চালু করতে পারলে এবং আপৎকালীন সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য সাধারণ জনগণের পাশাপাশি সরকারও বিনাসুদে ঋণ নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে সহজতর হতো। সুতরাং যেসব মানুষ জাকাত, সদকা খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের এবং দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য কর্জে হাসানা চালু করা উচিত। এ ব্যাপারে সমাজের আলেম, ওলামা, সুশীল সমাজ ও সরকারি মিডিয়াগুলো কর্জে হাসানার ব্যাপারে উপস্থাপন করলে কুরআনিক এ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক

সম্পর্কিত খবর