রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২০
সম্পাদকীয় ডেস্ক
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সিনহা হত্যা ও পুলিশি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
সিনহা হত্যা ও পুলিশি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

জুলাই মাসের শেষ দিন কক্সবাজারের টেকনাফ থানার বাহারছড়া পুলিশ ক্যাম্পের চেকপোস্টে একজন নিম্নপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গুলি করার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মেজর সিনহাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। যদি তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হতো তাহলে হয়তো তিনি বেঁচে থাকতেন। কিন্তু তাকে অনেক বিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। যদি বলা হতো ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে তাতেও কিছুটা আস্থা থাকত, কিন্তু হত্যার পর বিভিন্ন গল্প সাজিয়ে মেজর (অব.) সিনহার ব্যক্তিগত চরিত্রে দাগ লাগিয়ে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। যার ফলে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় মেজর (অব.) সিনহার ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। সেনাবাহিনীতে মাত্র কয়েক বছর কর্মরত থাকলেও তিনি পেশাগত বিভিন্ন কোর্স অল্প সময়ে সম্পন্ন করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি নিজ যোগ্যতাবলে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। তিনি দ্বিতীয় পেশার খোঁজে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যদি তার ক্যারিয়ারটি হঠাৎ করে এভাবে থামিয়ে দেওয়া না হতো, তাহলে হয়তো তিনি একদিন ডকুমেন্টারি ফিল্মের পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে নিজের স্থান করে নিতেন।

ঘটনা ঘটার পরপরই চেষ্টা হয়েছে নিহত মেজর (অব.) সিনহাকে মাদক কারবারি হিসেবে উপস্থাপন করার। এ কাজে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জড়িত হয়েছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন মেজর (অব.) সিনহার গাড়িতে ও হোটেলে মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। এমনকি এও বলা হয়েছিল, কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে মেজর (অব.) সিনহার যোগাযোগ রয়েছে। এভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ভণ্ডুল হয়েছে।

মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আশা করা যায় সত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতোপূর্বে আমাদের দেশে এ ধরনের বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল জানা যায় না। এখানে বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদালত রায় দিলেও তা কার্যকর করা হয় না। নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পর্যায়ে এলেও কয়েক বছর ধরে আমরা এর কোনো অগ্রগতি দেখছি না। তারও কয়েক বছর আগে ব্লগার রাজীব, লেখক অভিজিৎ রায়সহ বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া আজও শেষ হয়নি। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

 

সাধারণ বিচারকার্যে মানুষের আস্থ্থা নষ্ট হওয়ার ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোকে সমর্থন জানিয়ে থাকে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জনগণের এমন সমর্থনে আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। কিছু কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জনগণের সমর্থন এটাই প্রমাণ করে যে আমাদের দেশের আইনি ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং তার ওপর জনগণের আস্থা নেই। এই অনাস্থাকে পুঁজি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ সদস্য এক ধরনের ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে; তারা চুক্তিবদ্ধ হয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যে ঘটাচ্ছে না, এটা জোর দিয়ে বলা যায় না। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বছরখানেকের মধ্যে সারাদেশে চারশ'র অধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পেছনে অনেক ক্ষেত্রে জনগণের অভিযোগ রয়েছে যে সত্যিকার মাদক কারবারিদের আড়াল করতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে এবং এর পেছনে বিপুল অর্থের লেনদেন হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একটি বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে।

১৮৬১ সালের বেঙ্গল পুলিশ অ্যাক্টের অধীনেই এখন পর্যন্ত চলছে বাংলাদেশ পুলিশ। আমরা জানি, ১৮৫৭ সালে কলকাতা থেকে ভারতীয় সিপাহিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে সারা উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলুপ্ত হয় এবং উপমহাদেশে সরাসরি ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়। এর কয়েক বছর পর ব্রিটিশরা বেঙ্গল পুলিশ অ্যাক্ট প্রণয়ন করে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মধ্যে যেন কখনও সরকারবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠতে না পারে এবং জনগণের যে কোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলন যেন পুলিশ বাহিনী দিয়ে প্রতিহত করা যায়।

পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখেছি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফার আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনসহ জনগণের সব আন্দোলন প্রতিহত করতে সরকার পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করেছে দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে। ফলে পুলিশ কখনও জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি। তবে ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ প্রণীত আইনেও কিন্তু পুলিশকে অবাধে কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ওই আইনেও বলা হয়েছে, পুলিশ হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার কর্মচ্যুতিসহ জেল-জরিমানা হতে পারে। কিন্তু দুই দশক ধরে দেশজুড়ে পুলিশসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংগঠনের হেফাজতে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার অনেক সাক্ষীকেও হঠাৎ করে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে। এতে তদন্ত কার্যক্রম অগ্রসর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ বিচারের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

 

মেজর (অব.) সিনহার হত্যাকাণ্ডটির মধ্য দিয়ে সরকার, পুলিশ বাহিনী ও জনগণের মধ্যে আত্মসমালোচনার সুযোগ এসেছে। আমরা আমাদের দেশকে যদি একটি গণতান্ত্রিক, আধুনিক দেশ হিসেবে দেখতে চাই তাহলে উচিত হবে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা। অতীতে পুলিশের আধুনিকায়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, একসময় একটি পুলিশ রিফর্ম অর্ডিন্যান্স করার কথা ছিল, কিন্তু সেটা আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। আমাদের সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থ্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে জনগণের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করতে হবে, জনবান্ধব হতে হবে।

বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড বা গুম, অপহরণ ইত্যাদিকে যতই অস্বীকার করা হোক না কেন, বিশ্ব পরিমণ্ডলে এ বিষয়গুলো আলোচিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব বিষয়ে রিপোর্ট করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। আমরা আর্থসামাজিক উন্নয়নে অনেক এগিয়েছি। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ খুব ভালো করেছে, কিন্তু ভঙ্গুর রাষ্ট্রের সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান বাদে অন্যদের থেকে পিছিয়ে। আমরা ভঙ্গুর রাষ্ট্র সূচকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আইন বিভাগের ওপর জনগণের আস্থার অভাব। আমরা যদি এগুলো দূর করতে পারি তাহলে আমরা ভঙ্গুর রাষ্ট্র সূচকে উন্নতি করতে পারব এবং এর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তির উন্নতি হবে, বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান বাড়বে এবং সেইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

আশা করি, সিনহা হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে হত্যাকাণ্ডের অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীকে একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থ্থার উপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এরই মধ্যে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যার সাড়ে ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো গত ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আদালত। এই রায়ে তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আশা করা যায়, এই রায়ের মাধ্যমে এই বার্তাটি সর্বমহলে পৌঁছে যাবে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কখনোই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করবে না এবং এ ধরনের অপরাধীকে কঠোর দণ্ডের সম্মুখীন হতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর; ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

সম্পর্কিত খবর